ডেস্ক রিপোর্টঃ
দেশের গার্মেন্ট সেষ্টর স্বাভাবিক রাখতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিতে আনা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও গাজীপুর এলাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ নজরদারি ও টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য জড়িতদের মধ্যে ৫০০ জনের তালিকা তৈরি করে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে থানা পুলিশ, শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। একই সাথে তৈরি পোশাক শিল্পে স্থিতিশীলতা রক্ষা, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সরকারকে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে তারা বলেছেন, পলাতক ফ্যাসিস্টদের পাশাপাশি কতিপয় মালিক পক্ষের কিছু কর্মকা- এই শিল্পকে আবারো অস্থির করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে মজুরি বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে তৈরি পোশাক শিল্পে যে অস্থিরতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
গোয়েন্দা তদন্তে জানা গেছে, আন্দোলনের নামে বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পেছনে সাধারণ শ্রমিকরা নন, বরং একটি তৃতীয় পক্ষ বা উসকানিদাতা চক্র জড়িত। এই অস্থিরতায় আর্থিক জোগান দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (যেমন-হোয়াটসঅ্যাপ) নির্দেশনা ছড়ানোর অভিযোগে পলাতক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। এদের সাথে সহযোগীতা করছে ফ্যাসিস্টদের সহযোগী অর্ধশত গামের্ন্টস ব্যবসায়ী। এদের চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, এসআরবি, এপিবিএন ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে যৌথ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। একই সাথে সাধারণ শ্রমিকরা যাতে কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
সরকার এবং পোশাক খাতের ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি এই তৈরি পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করার জন্য দেশবিরোধী চক্র ষড়যন্ত্র করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একদিকে মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন কাঠামোর যৌক্তিক সমাধানের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বিশৃঙ্খলাকারীদের কঠোর হস্তে দমনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক এমপি-মন্ত্রীর সঙ্গে উঠাবসা ছিল মিরপুর-পল্লবীর তারিক আল মামুনের। বিশেষ করে মাহবুবউল আলম হানিফ, তার ভাই রফিকুল আলম, কুষ্টিয়া দৌলতপুরের পলাতক সাবেক এমপি সারোয়ার জাহান বাদশা ও রেজাউল হক চৌধুরী, কুষ্টিয়া-২ আসনের (ভেড়ামারা ও মিরপুর) কামারুল আরেফিন অন্যতম ঘনিষ্ট তারিক। পলাতক এসব এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যবহৃত রয়েছে তারিকের। একইসঙ্গে প্রতিমাসে পাশ্ববর্তী দেশে অবৈধ উপায়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন মোটাঅঙ্কের টাকা। বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পের নেপথ্যে জড়িতদের মধ্যে তার নামও এসেছে।
সূত্র জানায়, তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন ও অর্থায়নের অভিযোগে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তলবের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ তালিকায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও তৈরি পোশাক খাতের একাধিক উদ্যোক্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক সংসদ সদস্য ও এনভয় গ্রুপের মালিক আবদুস সালাম মুর্শেদী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এসএম মান্নান কচি।
এছাড়া আরও তালিকায় রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলম। তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তালিকায় পোশাক খাতের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ওয়েল গ্রুপের আবদুস সালাম, নিপা গ্রুপের খসরু চৌধুরী, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একেএম মোশাররফ হোসেন এবং তুসুকা গ্রুপের ফয়জুর রহমান। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছেন নাসরিন আক্তার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সহিদুল ইসলাম, সৈয়দ তৌফিকুল ইসলাম, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম ও ডা. নাসরিন আফরোজ। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন তারিন তাসলিমা, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, মোমেনা খাতুন, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান শিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন, সুরভী রহমান, শিরিন ইসলাম, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার ও নাহিদ খন্দকার। তালিকায় আরও রয়েছেন খতিব আব্দুল হাদী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার মোসারফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশারফ ও ফারিয়া রহমান।
সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে জানান তিনি। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি আকতার হোসেন বলেন, জনমনে আতঙ্ক তৈরি এবং নাশকতার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন ও অঙ্গ-সংগঠনের সদস্যরা রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এই তা-ব কোনো সাধারণ শ্রমিক অসন্তোষ ছিল না; এর নেপথ্যে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা এবং সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ একটি প্রভাবশালী চক্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধন, অর্থায়ন ও অভ্যন্তরীণ আঁতাত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ এবং আসামিদের ব্যবহৃত ১৬টি অ্যানক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জার গ্রুপের অডিও বার্তা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্যাডার ভাড়া এনে এবং গুজবের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ ও নাশকতা চালিয়ে গার্মেন্ট শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছিল।
ডিবির তদন্তে দেখা যায়, কালশীর ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচির মালিকানায় ছিল। পরে তিনি কাগজে-কলমে সরে দাঁড়ালেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পাঁচ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের হাতে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। এছাড়া রয়েছেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা কচি, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা, তার ভাগিনা আলিফ মোল্লা, সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরসহ বেশ কয়েকজন এই আন্দোলনে অর্থায়ন এবং নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছেন। শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে পুরো তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত ছক ছিল এটি। ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই সহিংসতার নেপথ্যে থাকা শীর্ষ পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

